ব্যাকরণ ও ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব

আজকের আলাপ ব্যাকরণ ও ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব নিয়ে। এই পাঠের দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশটি শেষে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও এর বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে পারবো। ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ, ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় ও কাঠামো, ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ, বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারবে। দ্বিতীয় অংশটিতে আছে  অনুশীলনমূলক কাজ, ভাষাভিত্তিক প্রশ্নোত্তর। সকল বোর্ডের বিগত বছরগুলোর প্রশ্নোত্তর ও পরীক্ষার জন্যে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর।

ব্যাকরণ ও ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব

Table of Contents

ব্যাকরণ ও ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব

প্রথম অংশ

১.১। ব্যাকরণ কী ও কেন

ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলা আবিষ্কারের নামই ব্যাকরণ। আঠারো শতকের পঞ্চম দশকে বাংলা ভাষার অত্যন্তরশৃঙ্খলা উদ্ঘাটনের চেষ্টা শুরু হয় বিদেশিদের দ্বারা ও লাতিন ইংরেজি ব্যাকরণ-কাঠামোতে (আসসুম্পসাঁও ১৭৪৩; হ্যালেড ১৭৭৮)। তবে বাংলা ব্যাকরণের বয়সকাল মাত্র আড়াই শ বছর, যেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বয়স হাজার বছর। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রেভারেন্ড জেমস্ কিথের ‘বঙ্গভাষার ব্যাকরণ (১৮২০)•, আর বাঙালিদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেন।

রামমোহনের পরবর্তী বহু বিদগ্ধ ভাষাতত্ত্ববিদ ও বৈয়াকরণের অক্লান্ত শ্রম ও সাধনায় আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। বাংলা ব্যাকরণের আলোকেই আমরা প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষার গঠন-প্রকৃতি ও শুদ্ধতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ কথা বলা শিখেছে মুখে মুখে। পরবর্তীতে সেই মৌখিক ভাষা কাঠামোকে বিশ্লেষণ করে ব্যাকরণ তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাই ব্যাকরণ কথা বলার ভাষা শেখার বিদ্যা নয়, বরং কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষার সৃষ্টিকাল থেকে বর্তমানকালের প্রচলিত ভাষা-বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করে তার একটি সর্বজন গৃহীত রূপ নির্দেশ করার শাস্ত্র। ব্যাকরণ ভাষার ভেতরের শৃঙ্খলা আবিষ্কার করে।

কোনো একটি জাতি যখন নিজের ভাষার মানরূপ স্থির করতে চায়, দূর করতে চায় ভাষার নানা রকম বিশৃঙ্খলা, তখন তাদের মধ্যে উৎসাহ দেখা দেয় ব্যাকরণ রচনার। এমন উৎসাহ দেখা গিয়েছিল প্রাচীন গ্রিসে, পুরোনো তাঁরতে, আঠারো শতকের ইংল্যান্ডে। ব্যাকরণবিদেরা খুঁজে খুঁজে বের করেন নানা সূত্র, বহু নিয়ম। ভাষার কিছু কিছু ব্যাপারকে তাঁরা ঘোষণা করেন অশুদ্ধ বলে। অন্যরা মেনে নেয় ব্যাকরণরচয়িতার অনুশাসন। তখন ভাষা পেতে থাকে স্থির ও সুস্থিত রূপ। মানুষের মন যত পরিণত হয়েছে, সে তার জীবন ও ভাষাকে তত শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে।

ব্যাকরণ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ— বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। ‘ভাষাকে বর্ণনা করে বা বিশ্লেষণ করে দেখাবার চেষ্টা থেকেই ব্যাকরণের জন্ম, কিন্তু কী বর্ণনা করে দেখানো হবে? দেখানো হবে কীভাবে ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়, শব্দগুলো কীভাবে গঠিত হয়, তাদের রূপান্তরই বা কীভাবে সাধিত হয়, সেগুলো বাক্যে কীভাবে বিন্যস্ত হয়- এ সব। এ সব যদি আমরা বিশ্লেষণ করে দেখি তা হলে ভাষার কোনটি স্বভাবধর্ম তা ঠিকমতো বুঝতে পারব, কীসে তার অধর্মচ্যুতি তাও বুঝতে পারব। ব্যাকরণের এই সূত্র বাংলা ব্যাকরণের বেলায়ও খাটে।

দীর্ঘদিন ব্যবহারে ভাষায় যেসব রীতি প্রচলিত হয়েছে তার বিশ্লেষণই ব্যাকরণের বিষয়বস্তু। ভাষা মনের ভাব প্রকাশ করে, আর, ব্যাকরণ সেই মনের ভাবকে শুদ্ধরূপে প্রকাশে সাহায্য করে। জনসাধারণের মুখে মুখে ভাষা নানা রূপ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বহতা নদীর মতো প্রবাহিত হয়ে চলে। ব্যাকরণ সেই ভাষার মৌল প্রবণতা, সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও উচ্চারণ-পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়ম রচনা করে তার বিশুদ্ধ প্রয়োগের পথ অঙ্কিত করে দেয়। ভাষাকে অবলম্বন করেই ব্যাকরণের সৃষ্টি। ভাষার গতি-প্রকৃতি, তার স্বরূপ, ধরন-ধারন ব্যাকরণে রূপ লাভ করে। ভাষার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ব্যাকরণ থেকে ধারণা লাভ করা যায়। ভাষা সৃষ্টি হয়েছে আগে, ব্যাকরণ এসেছে ভাষার পথ ধরে।

ভাষা ব্যবহারের ফলে যখন বিশেষ কিছু নিয়ম দাঁড়িয়ে গেছে তখন তা হয়ে উঠেছে ব্যাকরণের বিষয়। ব্যাকরণের নিয়ম কানুন ভাষাকে বিশুদ্ধ রাখতে সহায়তা করে। সেজন্যে ব্যাকরণকে ভাষা সংবিধান’ বলা হয়। সংবিধান বা শাসনতন্ত্রে যেমন রাষ্ট্রের আইনকানুনের সমাবেশ থাকে, তেমনি ব্যাকরণে থাকে ভাষার আইনকানুন। বিধিবিধানের সাহায্যে যেমন দেশ বা সংগঠন পরিচালিত হয়, তেমনি ভাষার সংবিধান বা আইনকানুন বা ব্যাকরণ জানা থাকলে ভাষা শুদ্ধরূপে ব্যবহার করা যায়।

ভাষা হৃদয়-মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এবং ব্যাকরণ তার নিয়ম-শৃঙ্খলা বা শাসন-শৃঙ্খলা। কোনো ভাষা শিখতে, জানতে বা লিখতে গেলে দেখা যায়— সেই ভাষার বর্ণমালা থেকে শুরু করে বাকাসংযোজন-প্রণালি পর্যন্ত সব কিছুতেই কোনো না কোনো নিয়মনীতি রয়েছে, যা মাতৃভাষার ক্ষেত্রে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তা আছে বলে মনে হয় না। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা বলেই এমনটি মনে হয়। আসলে ভাষা মুখ থেকে উচ্চারিত কতকগুলো এলোপাথাড়ি ধ্বনির সমষ্টি নয়। বরং মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ধ্বনিগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট ও সুশৃঙ্খল নিয়ম ও অর্থ থাকে।

যেমন- “আমি উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা-শিক্ষা’ বইটি পড়ি”— এই বাক্যটিকে যদি লেখা বা বলা হয় ‘বইটি ভাষা-শিক্ষা আমি উচ্চতর পড়ি বিশুদ্ধ স্বনির্ভর। তাহলে কোনো সঠিক অর্থ যেমন হয় না, তেমনি এর ভেতর বক্তব্য প্রকাশের কোনো নিয়ম বা শৃঙ্খলাও লক্ষ করা যায় না। কারণ এখানে বাংলা ভাষায় বাক্য গঠনের রীতি-নীতি মানা হয় নি। কাজেই দেখা যায়, ব্যাকরণ কোনো ভাষার উপাদান উপকরণ প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে তার রীতি-নীতি ও নিয়ম-পদ্ধতি আবিষ্কার করে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার সন্ধান দিয়ে থাকে। ভাষার এই অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য .উদ্ঘাটন ও নিয়ম-শৃঙ্খলা আবিষ্কার করে তার সুবিন্যস্ত ও সুসংহত বর্ণনার নামই ব্যাকরণ।

এক এক ভাষার নিয়ম-শৃঙ্খলা অন্য ভাষার চেয়ে আলাদা। ফলে প্রতিটি ভাষার ব্যাকরণও কমবেশি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ভাষাভেদে ব্যাকরণের নামকরণও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, বাংলা ভাষার জন্যে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, ইংরেজি ভাষার জন্য English Grammar ইত্যাদি।

১.২। ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ:

যে-গ্রন্থ কোনও ভাষাকে সম্যক বিশ্লেষণ করে তার গঠন-প্রকৃতি ও স্বরূপকে চিনিয়ে দেয়, তাকে শূন্যভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার করতে শেখায়, তাকে সে ভাষার ব্যাকরণ বলে। অর্থাৎ ব্যাকরণ হল, “ভাষার বিশ্লেষণ, প্রকৃতি ও প্রয়োগরীতি ও স্বরূপ আলোচনা ও ব্যাখ্যা করে এমন শাস্ত্র।

ব্যাকরণ ও বাংলা ভাষার ব্যাকরণের সঠিক সংজ্ঞার্থ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে ব্যাকরণের যথার্থ পরিচয় প্রকাশের জন্যে ভাষাচার্য ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭), মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সংজ্ঞার্থগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা যায়।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘যে বিদ্যার দ্বারা কোনও ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া তাহার স্বরূপটি আলোচিত। হয়, এবং সেই ভাষার পঠনে ও লিখনে এবং তাহাতে কথোপকথনে শূন্য-রূপে তাহার প্রয়োগ করা যায়, সেই বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ (Grammar) বলে।

বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, যে ব্যাকরণের সাহায্যে এই ভাষার স্বরূপটি সব দিক্‌ দিয়া আলোচনা করিয়া বুঝিতে পারা যায়, এবং শুদ্ধ-রূপে (অর্থাৎ তন্ত্র ও শিক্ষিত সমাজে যে রূপ প্রচলিত সেই রূপে) ইহা পড়িতে ও লিখিতে ও ইহাতে বাক্যালাপ করিতে পারা যায়, সেইরূপ ব্যাকরণ বুঝায়।

মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতে, ‘যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে।

বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠনপ্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষিত হয়। এবং এদের সম্পর্ক ও সুষ্ঠু প্রয়োগবিধি আলোচিত হয়, তাই বাংলা ব্যাকরণ।”

উল্লিখিত সংজ্ঞার্থগুলোর পাশাপাশি দু-একটি পুরোনো সংজ্ঞার্থও উল্লেখ করা যায়। যেমন,

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫-১৯৬৯) মতে, ‘যে শাস্ত্র জানিলে বাঙ্গালা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায় তাহার নাম বাঙ্গালা ব্যাকরণ।”

ড. সুকুমার সেন-এর (১৯০০-১৯৯২) মতে, ‘কোন ভাষার উপাদান সমগ্রভাবে বিচার ও বিশ্লেষণ যে বিদ্যার বিষয় তাহাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে।” বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতির বিচার ও বিশ্লেষণ এবং যে শাস্ত্রে জ্ঞান থাকলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে বলতে, লিখতে ও শিখতে পারা যায় তাকে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সংক্ষেপে বাংলা ব্যাকরণ বলে।

ড. মুহম্মদ এনামুল হকের (১৯০২-৮২) মতে, যে শাস্ত্রের দ্বারা ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া ইহার বিবিধ অংশের পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ণয় করা যায় এবং ভাষা রচনাকালে আবশ্যকমত সেই নির্ণীত তত্ত্ব ও তথ্য প্রয়োগ সম্ভবপর হইয়া উঠে, তাহার নাম ব্যাকরণ।”

উল্লিখিত সংজ্ঞার্থগুলোর আলোকে ড. হুমায়ুন আজাদ মন্তব্য করেছেন, “এখন ‘ব্যাকরণ’ বা ‘গ্রামার’ বলতে বোঝায় এক শ্রেণির ভাষাবিশ্লেষণাত্মক পুস্তক যাতে সন্নিবিষ্ট হয় বিশেষ বিশেষ ভাষার শূন্য প্রয়োগের সূত্রাবলি।

সুতরাং, উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা স্পষ্ট যে ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলার আলোচনাই ব্যাকরণ। ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে— ভাষায় কখন কী হওয়া উচিত তা বলে না বা নির্দেশ করে না বা বিধানপ্রণয়ন করে না, বর্ণনা করে মাত্র। ব্যাকরণের সাহায্যে ভাষার সংগোপন অভ্যন্তর সূত্র উদ্ঘাটন করে ভাষার বিশুদ্ধ রূপ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রসঙ্গত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেছেন, ‘আমি ব্যাকরণ নামে যে বিজ্ঞান শাস্ত্রের উল্লেখ করিতেছি, তাহার উদ্দেশ্য ভাষা শেখান নহে। উহার উদ্দেশ্য নিজে শেখা, ভাষার ভিতরে কোথায় কী নিয়ম প্রচ্ছন্নভাবে রহিয়াছে, তাহাই আলোচনা দ্বারা আবিষ্কার করা। ১০

ভাষা যেন বহতা নদী। উৎসদ্বার থেকে নদীর বিপুলকায় জলধারা বেরিয়ে সর্পিল গতিতে কত বাঁকে কত মোড় নিয়ে এগিয়ে চলে মোহনার দিকে। অনুরূপভাবে বিবর্তন, রূপান্তর ও ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে ভাষারও অগ্রগতি ঘটে। এ ক্ষেত্রে ব্যাকরণের ভূমিকা ভাষাকে নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা নয়, বরং পরিবর্তনের ধারায় ভাষাকে সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও জীবন্ত করে রাখা। তাই বলা হয়—ব্যাকরণ ভাষাকে শাসন করে না, বরং ভাষাই ব্যাকরণকে শাসন করে। অর্থাৎ, ব্যাকরণ ভাষাকে চলতে নির্দেশ দেয় না কিংবা শাসন করে না, বরং ভাষাই ব্যাকরণকে শাসন করে বা চলতে নির্দেশ দেয়, কিংবা ব্যাকরণ ভাষার বিষয়কে বর্ণনা করে মাত্র।

১.৩। ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব:

ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেছেন, আলো, জল, বিদ্যুৎ, বাতাস প্রভৃতি সম্বন্ধীয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য না জানিয়াও মানুষ বাঁচিয়াছে, বাচিতেছে ও বাঁচিবে। কিন্তু, তাই বলিয়া ঐ সমস্ত বস্তুর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে মানুষ অস্বীকার করিয়া বর্তমান সভ্যতার গগন-বিচুম্বী সৌধ নির্মাণ করিতে পারে নাই। ব্যাকরণ না জানিয়াও ভাষা চলিতে পারে, কিন্তু ভাষাগত সভ্যতা না হউক, অন্তত ভব্যতার পত্তন বা সমৃদ্ধি হইতে পারে না। … এই জন্যই শিক্ষিত ব্যক্তির পক্ষে ব্যাকরণ সম্বন্ধীয় সাধারণ জ্ঞানের সঙ্গে বিশেষ জ্ঞানও আবশ্যক।’ একটি ভাষা সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হলে সেই ভাষার ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ—

১। ব্যাকরণ কোনো ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে। যে কোনো ভাষার বিধি-বিধানের নিয়ামক হল ব্যাকরণ। তাই ব্যাকরণকে ভাষা সংবিধান’ বলা হয়।

২। ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠন-প্রকৃতি ও সে সবের সুষ্ঠু ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জ্ঞান ত করা যায় এবং লেখায় ও কথায় ভাষা প্রয়োগের সময় শুন্ধি অশুদ্ধি নির্ধারণ সহজ হয়। তাই বলা হয়েছে, ভাষা ব্যাকরণের অনুসারে গঠিত হয় না, গঠিত ভাষার নিয়মাদি নির্ধারণ ব্যাকরণের কর্তব্য।।

৩। ভাষার সৌন্দর্য অনুধাবনের জন্যেও সেই ভাষার ব্যাকরণ পাঠ অবশ্য কর্তব্য।

৪। সাহিত্যরসিকদের মতে সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে হলে পুরোপুরি সে রস গ্রহণ করতে হয়; ব্যাকরণ সে রস গ্রহণের সহায়ক। ব্যাকরণ পাঠের মাধ্যমে ছন্দ-অলঙ্কার বিষয়েও জ্ঞান লাভ করা যায়।

৫। ব্যাকরণের তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে উপযুক্ত জ্ঞান না থাকলে ভাষাগত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন উন্নত ভাবের বাহনরূপে ভাষাকে ব্যবহার করে উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না।

৬। ব্যাকরণ পাঠে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বেচ্ছাচারিতা রোধ হয়, ফলে ভাষার বিশুদ্ধতাও রক্ষা পায়।

৭। ভাষার সামগ্রিক রূপকে বোধের উপযোগী করে তোলা ব্যাকরণ শিক্ষার লক্ষ্য। বাংলা ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

অতএব ভাষাপ্রয়োগের জন্য এবং ভাষার সৌন্দর্য সম্পাদনের রীতি-নীতি (যেমন- ধ্বনি, শব্দ, হল, বাকা, অলঙ্কার, বাগ্‌ধারা প্রভৃতি) জানা ও প্রয়োগের জন্য ব্যাকরণ-জ্ঞান অপরিহার্য। তবে একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে- ভাষা আগে, পরে ব্যাকরণ। অতএব ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজন আমাদের আছে বটে, কিন্তু এর দ্বারা আচ্ছন্ন হলে চলবে না।

 

১.৪। ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় ও কাঠামো:

আমাদের মনের ভাব প্রকাশ পাচ্ছে এমন যে-কোনো একটি বাক্যের মধ্যেও ব্যাকরণের সব নিয়ম-কানুনের পরিচয় থেকে যায়। যেমন: ‘সে আমাকে চেনে’ এই বাক্যটি ভাঙলে আলাদা আলাদা যে তিনটি টুকরো (‘সে’, ‘আমাকে এবং ‘চেনে’) পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো প্রত্যেকটি পদ (নিচের রেখাচিত্রে পক্ষ কর)। বাক্যের মধ্যে আছে বলেই পদ, নইলে এগুলো শব্দ। পদ বা শব্দকে ভাঙলে পাওয়া যাবে বর্ণ বা ধ্বনি (নিচের রেখাচিত্রে লক্ষ করা। এই ধ্বনি হল ভাষার মূল ভিত্তি। ধ্বনির প্রতীক বর্ণ, বর্ণ মিলে গঠিত হয় শব্দ। শব্দের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়ে গঠিত হয় পদ।

কতকগুলো পদ মিলে যদি অর্থপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করে তাহলে তা হয় বাক্য। সুতরাং বাংলা ভাষার মূল গঠন উপাদান হল- ধ্বনি (sound), শব্দ (word) এবং বাক্য (sentence)। এই তিনটি উপাদানের সঙ্গে আরো একটি উপাদান রয়েছে, তা হল অর্থ (meaning)। শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ (যেমন- মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, বিপরীতার্থ ইত্যাদি) ভাষার মূল গঠন উপাদান হিসাবে বিবেচ্য। প্রত্যেক ভাষারই মৌলিক চারটি অংশ রয়েছে, যেমন

১। ধ্বনি (sound), ২। শব্দ (word), ৩। বাক্য (sentence) এবং ৪। অর্থ (meaning)।

লক্ষ কর:

সে আমাকে চেনে ::: বাক্যতত্ত্ব

রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব:

সে আমাকে চেনে

সে     আমা+কে     আমা + কে :::

ধ্বনিতত্ত্ব

(স + এ) + (আ + ম+ আ +ক+ এ) + (চ্ + এ + ন্+এ)

সব ভাষার ব্যাকরণেই প্রধানত নিম্নলিখিত চারটি বিষয়ের আলোচনা করা হয়:

ক. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)
খ. রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব (Morphology)
গ. বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax)
ঘ. অর্থতত্ত্ব (Semantics)

উল্লিখিত চার তত্ত্ব নিয়েই ব্যাকরণের কাঠামো গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া অভিধানতত্ত্ব (Lexicography), ছন্দ ও অলঙ্কার প্রভৃতিও ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়।

লক্ষ কর

  • ধ্বনির উচ্চারণপ্রণালি, উচ্চারণের স্বান, ধ্বনির প্রতীক বা বর্ণের বিন্যাস, ধ্বনিসংযোগ বা সন্ধি, ধ্বনির পরিবর্তন ও লোপ, ণত্ব ও ষত্ব-বিধান ইত্যাদি। বাংলা ব্যাকরণে ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
ব্যাকরণের কাঠামো
ব্যাকরণের কাঠামো

 

  • এক বা একাধিক ধ্বনির অর্থবোধক সম্মিলনে শব্দ তৈরি হয়, শব্দের অর্থযুক্ত ক্ষুদ্রাংশকে বলা হয় রূপ (Morpheme)। রূপ গঠন করে শব্দ। সেই জন্য শব্দতত্ত্বকে রূপতত্ত্ব বলে। উপসর্গ, সমাস, প্রত্যয়, শব্দরূপ, ধাতুরূপ, পদ প্রকরণ, ক্রিয়ার কাল, বচন, লিঙ্গ, পুরুষ ইত্যাদি শব্দতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
  • বাক্যের সঠিক গঠনপ্রণালি, বিভিন্ন উপাদানের সংযোজন বিয়োজন, এদের সার্থক ব্যবহারযোগ্যতা, বাক্যমধ্যে শব্দ বা পদের রূপ পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় বাক্যতত্ত্বে আলোচিত হয়।
  • শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ যেমন- মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, বিপরীতার্থ ইত্যাদি অর্থতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

১.৫। ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ:

ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে বাংলা ব্যাকরণ তিন প্রকারের: (ক) ঐতিহাসিক ব্যাকরণ, (খ) তুলনামূলক ব্যাকরণ ও (গ) ব্যবহারিক ব্যাকরণ। কিন্তু ব্যাকরণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যাকরণকে চার ভাগে ভাগ করেছেন, যথা

ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ (Descriptive grammar)

খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (Historical grammar)

গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ (Comparative grammar)

ঘ. দার্শনিক-বিচারমূলক ব্যাকরণ (Philosophical grammar).

ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ:

বিশেষ কোনো কালে বা যুগে, কোনো একটি ভাষার রীতি ও প্রয়োগ ইত্যাদি বর্ণনা করা এ ধরনের ব্যাকরণের বিষয়বস্তু এবং সেই বিশেষ কালের ভাষা যথাযথ ব্যবহার করতে সাহায্য করা এর উদ্দেশ্য।

খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ :

একটি ভাষার উৎপত্তি থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সে ভাষার ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এর লক্ষ্য।

গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ :

যে শ্রেণির ব্যাকরণ কোনো বিশেষ কালের বিভিন্ন ভাষার গঠন, প্রয়োগরীতি ইত্যাদির তুলনামূলক আলোচনা করে থাকে, তা-ই তুলনামূলক ব্যাকরণ।

ঘ. দার্শনিক-বিচারমূলক ব্যাকরণ:

ভাষার অন্তর্নিহিত চিন্তাপ্রণালিটি আবিষ্কার ও অবলম্বন করে সাধারণভাবে কিংবা বিশেষভাবে ভাষার রূপের উৎপত্তি ও বিবর্তন কীভাবে ঘটে থাকে, তার বিচার করা এর উদ্দেশ্য।

১.৬। বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও বিকাশ:

হাজার বছরেরও বেশি সময়ের অধিক বয়স্ক বাংলা ভাষা বর্ণিত ও বিশ্লেষিত হয়ে আসছে মাত্র আড়াই শ বছর ধরে। বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বলতে গেলে আমাদের আজ থেকে আড়াই হাজার আর আড়াই শ বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলা ভাষার উৎপত্তিকালে বা তারও শত শত বৎসরের মধ্যেও বাংলা ব্যাকরণ রচিত হয় নি। বাংলা ব্যাকরণ চর্চার সূচনা হয় বাংলা ভাষার উন্মেষের আট শ বছর পর। পাণিনি থেকে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ব্যাকরণের এই ধারাটি আড়াই হাজার বছরের, আর মানোএল থেকে সুনীতিকুমার— বাংলা ব্যাকরণের এই ধারাটি আড়াইশো বছরের। প্রথম ধারাটির কাছে দ্বিতীয় ধারাটি ঋণী, তবু তা স্বতন্ত্র খাতে বয়ে চলতে চেয়েছে নিজের প্রাণশক্তিতে।

ব্যাকরণ শব্দটির উৎস কৃষ্ণযজুর্বেদে। যেখানে দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, আমাদের এই ভাষাকে আপনি ব্যাকৃত করুন, অর্থাৎ এই ভাষার ব্যাকরণ নির্দেশ করুন। এ ছাড়া ছয়টি বেদাঙ্গের মধ্যে শিক্ষা, নিরুক্ত, ব্যাকরণ ও ছন্দ– এ চারটিই ভাষাবিজ্ঞানের অঙ্গ। পাণিনিপন্থী বৈয়াকরণেরা বেদাঙ্গ অন্তর্ভুক্ত এই শিক্ষা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। শিক্ষা ও বৈদিক প্রাতিশাধ্যকে অবলম্বন করে বিবর্তিত হয়েছিল পরবর্তী ব্যাকরণ, যার মধ্যে পাণিনির স্থান ছিল বিশিষ্ট।

পাণিনি ব্যাকরণের ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাত্যায়ন ও পতঞ্জলি। কাত্যায়ন ছিলেন পাণিনির দোষদর্শী, পতঞ্জলি ছিলেন সমর্থক। পাণিনির মূল রচনা এই দুজনের সংশোধন ও সংযোজনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছিল। এই তিনজনকে বলা হয় ত্রিমুনি।

ব্যাকরণ রচনার প্রাথমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই ভাষার সর্বজনমান্য রূপ বা standard form ঠিক করাই ছিল ব্যাকরণের প্রধান উদ্দেশ্য। সে যুগে ব্যাকরণ ছিল ‘আনুশাসনিক’। ভাষাকে শাসন করা, অর্থাৎ ভাষার নানারূপ বিশৃঙ্খলা দূর করে বহু সূত্র, বহু নিয়মের মধ্যে বেঁধে, শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্দেশ করে, ভাষার একটি সুস্থ রূপ স্থির করা ছিল প্রধান বিবেচনা। মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দ থেকে চেষ্টা শুরু হয় ভাষাশাসনের।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ব্যাকরণবিদ পাণিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থে এলোমেলো ভাষাগুচ্ছকে সংস্কার করে সর্বভারতীয় একটা সুস্থির রূপ দান করেন। যার নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। তবে এ ভাষা শুধু লেখার ভাষা এবং পণ্ডিতের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ভাষা হয়ে রইল।

পরবর্তী কালে (সপ্তদশ শতকে) পাণিনি-চর্চায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভট্টোজি দীক্ষিতের ‘সিদ্ধান্তকৌমুদী’। পাণিনি ধারা ছাড়াও ঐন্দ্র, চালু, জৈনেন্দ্ৰীয়, শাকটায়নী, হেমচন্দ্রীয়, কাতন্ত্র, সারষত মুগ্ধবোধ, ভৌমর, সৌপস্থ, কালাপিক ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যাকরণের ধারা প্রচলিত ছিল।

ভট্টোজি দীক্ষিতের সিন্ধান্তকৌমুদীকে’ সহজ সংক্ষিপ্ত করে রচিত হয়েছিল ‘লঘুকৌমুদী। এই লঘুকৌমুদীও বাংলায় প্রচলিত ছিল। সিদ্ধান্তকৌমুদী ও মুগ্ধবোধ (মুগ্ধ অর্থাৎ মূঢ় বা অল্পজ্ঞদের বোধের নিমিত্তে রচিত ব্যাকরণ) প্রভৃতি ব্যাকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘ব্যাকরণকৌমুদী’ (১৮৫৩) রচনা করেন। এতে বাংলা ব্যাখা সংযোজিত হওয়ায় এবং শব্দরূপ ধাতুরূপাদির সহজ বিন্যাস থাকায় ব্যাকরণচর্চা সহজ হয়। বাংলা বৈয়াকরণেরাও উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা-শিক্ষা সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মগুলো ভালোভাবে জানবার সুযোগ পান। শব্দরূপ ও ক্রিয়ারূপের বিন্যাস, সন্ধি, সমাস, ধাতুর গণবিভাগ ইত্যাদি বহু বিষয়ে বাংলা ব্যাকরণ বিদ্যাসাগরের এই ‘ব্যাকরণকৌমুদীর কাছে ঋণী।

বাংলা ব্যাকরণ চর্চার ইতিহাস সংস্কৃত ব্যাকরণের মতো পুরাতন নয়। বহু বাঙালি ব্যাকরণবিদ সংস্কৃত ব্যাকরণ চর্চা করলেও উনিশ শতকের আগে বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ে আগ্রহ দেখা যায় নি। আঠারো শতকের চল্লিশের দশকে মুদ্রিত হয় বাংলা ব্যাকরণের প্রথম পুস্তক মানোএল দা আসসুম্পসাঁও (Manoel da Assumpcam) এর দ্বিতাধিক শব্দকোষ ও খণ্ডিত ব্যাকরণ।

ঢাকার ভাওয়ালে, ১৭৪৩ খ্রিস্টীয় অব্দে, তিনি রচনা করেন ‘ভোকাবুলারিও এম ইসিওমা বেনগল্লা, ই পর্তুগিজ দিভিদিদো এম দুয়াস পার্হেস’ (Vocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes) নামে। ১৯ প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশ ব্যাকরণের একটি সংক্ষিপ্তসার এবং দ্বিতীয় অংশ বাংলা-পর্তুগিজ ও পর্তুগিজ-বাংলা শব্দাভিধান। গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। এর কাঠামোগত আদর্শ গৃহীত হয়েছে লাতিন ভাষার ধাঁচে। আর এতে শুধু রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বই আলোচিত হয়েছে, ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই।।

আসসুম্পসাঁওর শব্দকোষ ও ব্যাকরণ প্রকাশের তিন দশক পর ১৭৭৮-এ হুগলি থেকে প্রকাশিত হয় নাঘেনিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের (Nathaniel Brassey Halhed) ব্যাকরণ ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (A Grammar of the Bengal Language)। হ্যালহেডের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে রচিত হলেও এতেই প্রথম বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়, এ কারণে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে গ্রন্থটি মূল্যবান। চার্লস উইলকিনসন এবং পঞ্চানন কর্মকার যৌথ

১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশিত হ্যালহেড-এর বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের নামপত্র (বামে) এবং বইয়ের একটি পৃষ্ঠা (ডানে))
১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশিত হ্যালহেড-এর বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের নামপত্র (বামে) এবং বইয়ের একটি পৃষ্ঠা (ডানে))

প্রচেষ্টায় ছাপাখানার জন্য যে বাংলা হরফ (font) প্রবর্তন করেন, তার সাহায্যেই হ্যালহেডের গ্র বাংলা উদাহরণগুলো মুদ্রিত হয়েছে। আঠারো শতকে রচিত বাংলা ব্যাকরণের এ দুটি নমুনা ছাড়া আর কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় নি। উনিশ শতকে সৃষ্টি হয়, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায়, বাংলা ব্যাকরণ পুস্তকের এক অবিরাম ধারা।

উনিশ শতকে ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণ প্রণেতাদের মধ্যে আছেন কেরি (১৮০১), গঙ্গাকিশোর (১৮১৬), কিন্তু (১৮২০), হটন (১৮২১), রামমোহন রায় (১৮২৬), শ্যামাচরণ সরকার (১৮৫০), বিমূস্‌ (১৮৭২), শ্যামাচরণ গাঙ্গুলি (১৮৭৭), যদুনাথ ভট্টাচার্য (১৮৭৯), কে পি ব্যানার্জি (১৮৯৩) প্রমুখ। বাংলায় বাংলা ব্যাকরণ প্রণেতাদের মধ্যে আছেন রামমোহন রায় (১৮৩৩), শ্যামাচরণ সরকার (১৮৫২), ব্রজনাথ বিদ্যালঙ্কার (১৮৭৮), নিত্যানন্দ চক্রবর্তী (১৮৭৮), নীলমণি মুখোপাধ্যায় (১৮৭৮), কেদারনাথ তর্করত্ন (১৮৭৮), চিন্তামণি গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮১), প্রসন্নচন্দ্র বিদ্যারত্ন (১৮৮৪), বীরেশ্বর পাঁড়ে (১৮৯১), নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণ (১৩০৫)।

বিশ শতকের শুরুর দশকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দাবি (১৩০৮) করেন যে ‘বাঙ্গালা ভাষায় কিছু কম আড়াই শত বাঙ্গালা ব্যাকরণ লিখিত হইয়াছে। কিন্তু তার এক দশক পরে যোগেশচন্দ্র রায় বলেন (১৩১৯) যে, তিনি তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামক রচনা লেখার সময় দেখেছেন মাত্র চারটি ব্যাকরণ পুস্তক রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ (১৮৩৩), শ্যামাচরণ শর্মার ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ (১২৫৯), নকুলেশ্বর বিদ্যাভূষণের ভাষাবোধ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ (১৩০৫: চতুর্দশ মুদ্রণ), লোহারাম শিবেরত্নের ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ (সংবৎ ১৯৩৬)।

বাংলা ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে উনিশ শতকের তুলনায় বিশ শতক বহুমাত্রায় বৈচিত্র্যপূর্ণ। উনিশ শতকে এ বিষয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও কোনো অনুসরণীয় আদর্শ তৈরি করা সম্ভবপর হয় নি। বিশ শতকে ভাষার আদর্শের মতো ব্যাকরণ রচনারও একটি রূপ ও পদ্ধতির অনুসন্ধানে বেশ কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। সেগুলোর মধ্যে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ এবং ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া প্রিয়ারসনের The Linguistic Survey of India য বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সন্নিবেশিত হওয়ায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় (১৯১৩) বাংলা ভাষা বিদেশেও পরিচিতি লাভ করে।

বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ চর্চার আরেকটি প্রবণতা পরিস্ফুট হতে থাকে, যার সঙ্গে আধুনিক ইউরোপীয় ভাষা চর্চার সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্ট। বর্তমানে দুই বাংলার ভাষা গবেষণায় যে প্রধান ধারাগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে: ১. তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, ২. সাংগঠনিক ও রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ এবং ৩, উপভাষা তত্ত্ব।

বিশ শতকের শুরুতেই প্রকাশিত হয় শ্রীনাথ সেনের ‘ভাষাতত্ত্ব’ (১৯০১) গ্রন্থটি। নানা অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও একেই বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার প্রথম নিদর্শন বলে বিবেচনা করা হয়। সমসাময়িক কালে ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির (১৮৫১-১৯৫৬) ‘বাঙ্গালা ভাষা (১৯১২)। বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণের অপর নিদর্শন হচ্ছে বিজয়চন্দ্র মজুমদারের (১৮৬১-১৯৪২) The History of the Bengali Language (১৯২০)। তিনিই প্রথম ঐতিহাসিকভাবে বাংলা ভাষায় বিদেশি উপাদানগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।

এ গ্রন্থটি প্রকাশের পর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of the Department of Letters (Vol. III. ১৯২০)-এ ‘Outlines of an Historical Grammar of the Bengali Language শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার আদর্শ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭) রচিত The Origin and Development of the Bengali Language (ODBI. ১৯২৬) নামক অদ্বিতীয় গবেষণা গ্রন্থে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা ভাষার উপাদানগুলো চিহ্নিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। এ গ্রন্থের মাধ্যমে বাঙালির মাতৃভাষা চর্চার যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী অনেকের ভাষা চর্চার সৌধ।

উল্লিখিত দুশ বছরে প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণের যে ধারা গড়ে ওঠে তার মধ্যে মিশ্রণ ঘটে তিন রকমের ব্যাকরণের লাতিন, ইংরেজি ও সংস্কৃতের। এ-ব্যাকরণ পুস্তকরাশি স্বায়ত্তশাসিত বাংলা ভাষার সূত্র খুঁজেছে কখনো ইংরেজি ব্যাকরণের কাঠামোতে, কখনো সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতিতে।

বাংলা ব্যাকরণের আদি প্রণেতারা বিদেশি ও বিভাষী; তাঁরা লাতিন ও ইংরেজি ব্যাকরণের ক্যাটেগরি আবিষ্কারের চেষ্টা করেন বাংলা ভাষায়। পরে আসেন সংস্কৃত পন্ডিতেরা, যারা বাংলাকে বিকৃত সংস্কৃত ভেবে সংস্কৃত ব্যাকরণের ক্যাটেগরিরাশি আরোপ করেন বাংলার ওপর। বাংলা ব্যাকরণ রচনায় উদ্যোগী হয়ে সংস্কৃত পণ্ডিতেরা সংস্কৃত থেকে নিয়ে আসেন অজস্র সংস্কৃত সূত্র, এবং সৃষ্টি করেন এক দুর্বল আনুশাসনিক শাস্ত্র, যা বাংলা ভাষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত ভাষারূপে ব্যাখ্যা-বর্ণনা-বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়। এ-সব ব্যাকরণকে লক্ষ করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য (১২৯২) করেছিলেন,

‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই। সংস্কৃত ব্যাকরণের একটু ইতস্তত করিয়া তাহাকে বাংলা ব্যাকরণ নাম দেওয়া হয়।”

বিশ শতকে রচিত বাংলা ব্যাকরণগুলো প্রকৃতি ও প্রণালিতে আগের শতকের বৈশিষ্ট্যই অনুসরণ করেছে, যদিও কোনো কোনোটি বেশ ব্যাপক (সুনীতিকুমার, ১৯৩৯)। ফলে প্রথাগত ব্যাকরণের ধারার বই চলে প্রথাগত খাতেই। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য্য ও স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলা ব্যাকরণকাঠামোর স্বাধিকার প্রথম, ও অনেকটা পরোক্ষভাবে, দাবি করা হয় ‘বালক’ ও ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত তরুণ রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি প্রবন্ধে বাংলা উচ্চারণ! (১২১২), ‘স্বরবর্ণ অ’ (১২৯১), ও ‘টা টো টে´ (১২৯৯)-তে। ১৩০১-এ (১৮৯৪) প্রকাশিত হয় ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’, যার চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের দু সংখ্যায় প্রকাশিত হয় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উপসর্গের অর্থবিচার’ (১৩০৪, ১৩০৫)।

‘উপসর্গের অর্থবিচার’ নামক দীর্ঘ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন প্রকল্পটিতেই সুষ্পষ্টভাবে বিকশিত হয় নব্য ব্যাকরণ-দৃষ্টি, যার লক্ষ্য বাংলা ভাষাকে বাংলা হিসেবেই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা। দ্বিজেন্দ্রনাথ যে আন্দোলনের সূচনা করেন, তাকে এগিয়ে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁদের বিরোধীগোত্রে সক্রিয়ভাবে অবস্থান করেন শরত্চন্দ্র শাস্ত্রী, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ, শ্রীনাথ সেন প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ যখনই প্রথাগত ব্যাকরণ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন তখনই তাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের নামান্তর রূপান্তর বলে নির্দেশ করেছেন, খুঁজে বের করেছেন বাংলা ভাষার বহু একান্ত আপন বৈশিষ্ট্য এবং আবেদন জানিয়েছেন প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ রচনার।

পরবর্তী কালে বাংলা ব্যাকরণের বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান অবদান রেখেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. সুকুমার সেন, ড. মুহম্মদ এনামূল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। পশ্চিমবঙ্গের ভাষাতাত্ত্বিকগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. পবিত্র সরকার, প্রবাল দাশগুপ্ত, সুভাষ ভট্টাচার্য, উদয়নারায়ণ সিংহ, শিশিরকুমার দাস, পরেশচন্দ্র মজুমদার, ড. রামেশ্বর “শ প্রমুখ। বাংলাদেশে নতুন ভাষাচিন্তার গবেষকগণ হলেন ড. হুমায়ুন আজাদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড. রফিকুল ইসলাম, মনসুর মুসা, ড. কাজী দীন মুহম্মদ, রাজিব হুমায়ুন, মহাম্মদ দানীউল হক, ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, আমিনুল ইসলাম ও আরো অনেকে।

তাঁদের অবদান সম্পর্কে ড. রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, ‘কালানুক্রমিক, তুলনামূলক, বর্ণনামূলক, রূপান্তরমূলক, সমাজ ভাষাতত্ত্ব যে কোনো পদ্ধতিতেই হোক না কেন তাঁরা এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য থেকে উদ্ভূত কোনো গবেষণা পদ্ধতির উদ্ভব ঘটাতে পারেন নি, এমনকী তাঁরা কেউ আধুনিক পদ্ধতিতে বাংলা ভাষার একটি ব্যাকরণও রচনা করেন নি। তাঁদের কৃতিত্ব ভাষাতত্ত্বের প্রায় প্রতিটি শাখায় বাংলা ভাষায় গবেষণাকর্ম পরিচালনা। কিন্তু এখন বোধ হয় সময় হয়েছে বাংলা ভাষা বিশ্লেষণের জন্য বাংলা ভাষার ধারণা থেকে উদ্ধৃত নিজস্ব পদ্ধতির উদ্ভাবনা এবং তার মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিশ্লেষণ। বিশেষত বাংলা ভাষায় খাঁটি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা। ১২ প্রসঙ্গত ড. হুমায়ুন আজাদ মন্তব্য করেছেন,

বিশ শতকের আশির দশকেও অবাস্তবায়িত থেকে যায় নবা ব্যাকরণবিদদের স্বপ্ন, যার নাম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ

“বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ চর্চায় অবাঙালি পন্ডিত ও গবেষকদের ভূমিকাও কম নয়। জর্জ আব্রাহাম প্রিয়ার্সন বাংলা উপভাষাসমূহের প্রকৃতি নিরূপণে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন। বাংলা ধ্বনি ও রূপতত্ত্বের প্রকৃতি বিচারে ভূমিকা রেখেছেন চার্লস এ ফার্গুসন। ই এস বিকোভা রুশ ভাষায় লিখেছেন বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। সম্প্রতি হানা বুথ ভ্রমসন ইংরেজিতে সমকালীন বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লিখেছেন। এ ছাড়াও বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ চর্চার ক্ষেত্রে জে ডি অ্যান্ডার্সন, ওয়াল্টার সাটন পেজ, এডোয়ার্ড সি ডিমক, দুশান জ্‌বাভিতেন, ব্রাদার জেমস্ প্রমুখের নাম স্মরণীয়।

এভাবেই বাংলা ব্যাকরণ রচনার ধারায় নতুন চিন্তা-ভাবনার আগমন ঘটেছে। ১৯০১ সাল থেকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এ বাংলা ভাষার ঘাঁটি ব্যাকরণ রচনার লক্ষ্যে উপর্যুক্ত পরাক্রমশালী লেখক-পণ্ডিত-বিজ্ঞানীরা যে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান-চর্চার প্রচার ও প্রসারের ফলে তা আরো জোরালো ভিত্তি পেতে থাকে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের সূচনায় বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির সর্বাত্মক প্রয়াস এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সহযোগিতায় দু খণ্ডে রচিত হয় ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ (ডিসেম্বর, ২০১১)। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ এক যুগান্তকারী প্রয়াস। কাজটি বাংলা ব্যাকরণ চর্চার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে মাইল ফলক হয়ে থাকবে।”

[[[[ হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী কিনারের দৃষ্টিতে সামাজিক অভিজ্ঞতার পথ ধরে ভাষার আবির্ভাবের ফলেই ব্যাকরণের উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যাবরাম নোয়াম চমস্কি ভাষাকে শুধুমাত্র একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করার দৃঢ় মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। চমস্কি মনে করেন, সকল স্বাভাবিক মানুষের মগজে একটি মৌলিক বিশ্বজনীন ব্যাকরণ সূত্রবদ্ধ হয়ে আছে। এই বিশ্বজনীন ব্যাকরণে সকল ভাষার জন্য অভিন্ন কিছু নিয়মাবলি নিহিত আছে।

সুনির্দিষ্ট ভাষাসমূহের ব্যাকরণ একই পরিবারের সদস্য। স্কিনার ও চমস্কির তত্ত্ব দুটি সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সম্ভবত দুটি তত্ত্বের মধ্যেই সত্য নিহিত আছে। একদিকে ভাষাকে আমরা দেখতে পারি বিবর্তন ও সামাজিকায়নের ধারাবাহিকতা রূপে, অন্যদিকে ভাষাকে একান্তভাবে মানবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়। বাংলাভাষা তাই আমাদের দিয়েছে মানুষের মর্যাদা, বাংলা ভাষার জন্যই আমরা মানব সমাজে চিহ্নিত হয়েছি আলাদা পরিচয়ে ]]]]

তৃতীয় পাঠ : অনুশীলনমূলক কাজ বা ভাষা-অনুশীলন . সকল বোর্ডের বিগত ১৫ বছরের প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: ১। ব্যাকরণ / বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব আলোচনা কর। (চ), বো,, কু, বো, ২০০০: চ, বো, ‘০১. রা. বো. ০২, য. বো. ০৪, ৰ, বো, ‘০৫, কু, লো, ১০

অথবা, ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজন উল্লেখপূর্বক আমরা কেন ব্যাকরণ পড়ব আলোচনা কর।

উত্তর: ব্যাকরণ ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলার আবিষ্কারের নাম ব্যাকরণ। ‘ব্যাকরণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি , বি + আ + √কৃ + অন, এর অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা। ব্যাকরণের সঠিক সংজ্ঞার্থ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে ভাষাচার্য ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭), মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সংজ্ঞার্থগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, যে বিদ্যার দ্বারা কোনও ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া তাহার স্বরূপটি আলোচিত হয়, এবং সেই ভাষার পঠনে ও লিখনে এবং তাহাতে কথোপকরনে শুদ্ধ-রূপে তাহার প্রয়োগ করা যায়, সেই বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ (Grammar) বলে।’

মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতে, যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে। প্রিয়োজনে, বাংলা ব্যাকরণ-এর সংজ্ঞার্থের জন্য প্রথম পাঠের ১.২ দেখ।।

ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব

ভাষা সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হলে সেই ভাষার ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজন অপরিসীম, কারণ—

১। ব্যাকরণ কোনো ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে। ভাষার বিধি-বিধানের নিয়ামক হল ব্যাকরণ। তাই ব্যাকরণকে ‘ভাষা সংবিধান’ বলা হয়।

২। ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠন-প্রকৃতি ও সে সবের সুষ্ঠু ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জানা যায়। এবং লেখায় ও কথায় ভাষা প্রয়োগের সময় শুদ্ধি অশুদ্ধি নির্ধারণ সহজ হয়।

৩। ভাষার সৌন্দর্য সম্ভোগের জন্যও সেই ভাষার ব্যাকরণ পাঠ অবশ্যকর্তব্য।

৪। সাহিত্যের রস আস্বাদনের জন্যও ব্যাকরণ জানা আবশ্যক।

৫। ব্যাকরণের তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে উপযুক্ত জ্ঞান না থাকলে ভাষাগত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন উন্নত ভাবের বাহনরূপে ভাষাকে ব্যবহার করে উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না।

৬। ব্যাকরণ পাঠে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যেচ্ছাচারিতা রোধ হয়, ফলে ভাষার বিশুদ্ধতাও রক্ষা হয়।

৭। ভাষার সামগ্রিক রূপকে বোধের উপযোগী করে তোলা ব্যাকরণ শিক্ষার লক্ষ্য। বাংলা ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

প্রশ্ন : ২। ব্যাকরণ কত প্রকার ও কী কী ? আলোচনা কর।

উত্তর : ব্যাকরণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যাকরণকে চার ভাগে ভাগ করেছেন, যথা :

ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ (Descriptive grammar)

খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (Historical grammar)

গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ (Comparative grammar)

ঘ. দার্শনিক-বিচারমূলক ব্যাকরণ (Philosophical grammar)

ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ :

বিশেষ কোনো কালে বা যুগে, কোনো একটি ভাষার রীতি ও প্রয়োগ ইত্যাদি বর্ণনা করা এ-ধরনের ব্যাকরণের বিষয়বস্তু এবং সেই বিশেষ কালের ভাষা যথাযথ ব্যবহার করতে সাহায্য করা এর উদ্দেশ্য।

খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ:

একটি ভাষার উৎপত্তি থেকে বর্তমান কালু পর্যন্ত সে ভাষার ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এর লক্ষ্য।

গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ:

যে-শ্রেণির ব্যাকরণ কোনো বিশেষ কালের বিভিন্ন ভাষার গঠন, প্রয়োগরীতি ইত্যাদির

তুলনামূলক আলোচনা করে থাকে, তা-ই তুলনামূলক ব্যাকরণ।

ঘ. দার্শনিক-বিচারমূলক ব্যাকরণ:

ভাষার অন্তর্নিহিত চিন্তাপ্রণালিটি আবিষ্কার ও অবলম্বন করে সাধারণভাবে কিংবা বিশেষভাবে ভাষার রূপের উৎপত্তি ও বিবর্তন কীভাবে ঘটে থাকে, তার বিচার করা এর উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন : ৩। বাংলা ব্যাকরণের পরিধি বা আলোচ্য বিষয় সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
অথবা, ব্যাকরণে কী কী বিষয় আলোচিত হয়? উদাহরণসহ আলোচনা কর। কু. বো. ০১, ব, বো, ৩২)
অথবা, একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণের কাঠামো প্রস্তুত কর।

উত্তর:

ব্যাকরণের পরিধি বা আলোচ্য বিষয় প্রত্যেক ভাষারই তিনটি মৌলিক অংশ থাকে, যথা—

১. ধ্বনি (sound) 2. শব্দ (word) এবং ৩. বাক্য (sentence)। উল্লিখিত তিনটি উপাদানের সঙ্গে আরো একটি উপাদান রয়েছে, তা হল অর্থ (meaning)। শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ (যেমন— মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, বিপরীতার্থ ইত্যাদি) ভাষার মূল গঠন উপাদান হিসাবে বিবেচ্য। অতএব ভাষার মৌলিক অংশ চারটি, যেমন—

১। ধ্বনি (sound), ২। শব্দ (word), ৩। বাক্য (sentence) এবং ৪। অর্থ (meaning) |

ফলে, সব ভাষার ব্যাকরণেই প্রধানত চারটি বিষয়ের আলোচনা করা হয় ক. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)

খ. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব (Morphology)

ঘ. অর্থতত্ত্ব (Semantics)

গ. বাক্যতত্ত্ব (Syntax) এই চার তত্ত্ব নিয়েই ব্যাকরণের কাঠামো গড়ে উঠেছে। তবে এই কাঠামোর মধ্যে ছন্দ ও অলঙ্কারকে স্থান

দেওয়ার পক্ষে কেউ কেউ মত ব্যক্ত করেছেন।

আলোচনা

১। ধ্বনিতত্ত্ব : ধ্বনির উচ্চারণপ্রণালি, উচ্চারণের স্থান, ধ্বনির প্রতীক বা বর্ণের বিন্যাস, ধ্বনিসংযোগ বা সন্ধি, ধ্বনির পরিবর্তন ও লোপ, ণত্ব ও ষত্ব-বিধান ইত্যাদি বাংলা ব্যাকরণে ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

২। শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব: এক বা একাধিক ধ্বনির অর্থবোধক সম্মিলনে শব্দ তৈরি হয়, শব্দের অর্থযুক্ত ক্ষুদ্রাংশকে বলা হয় রূপ (Morpheme)। রূপ গঠন করে শব্দ। সেই জন্য শব্দতত্ত্বকে রূপতত্ত্বও বলে। এ অংশে শব্দের প্রকার, পদের পরিচয়, শব্দগঠন, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, লিঙ্গ, বচন, ধাতু, শব্দরূপ, কারক, সমাস, ক্রিয়া প্রকরণ, ক্রিয়ার কাপ, ক্রিয়ার ভাব, শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থগত পার্থক্য ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা থাকে।

৩। বাক্যতত্ত্ব: বাক্য, বাক্যের সঠিক গঠনপ্রণালি, বিভিন্ন উপাদানের সংযোজন, বিয়োজন, এদের সার্থক ব্যবহারযোগ্যতা, বাক্যমধ্যে শব্দ বা পদের রূপ পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় বাক্যতত্ত্বে আলোচিত হয়।

৪। অর্থতত্ত্ব : শব্দের অর্থবিচার, বাক্যের অর্থবিচার, অর্থের বিভিন্ন প্রকারভেদ (যেমন— মুখ্যার্থ, গৌণার্থ, বিপরীতার্থ ইত্যাদি) অর্থতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

৫। ছন্দ-প্রকরণ : এ অংশে ছন্দের প্রকার ও নিয়মসমূহ আলোচিত হয়।

৬। অলঙ্কার-প্রকরণ : অলঙ্কারের সংজ্ঞার্থ ও প্রকার ইত্যাদি বিষয় এ-অংশে আলোচিত হয়।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর বিস্তৃত আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচিত হতে পারে। সবশেষে বলা যায়, ভাষা পরিবর্তনশীল, ভাষা কখনও এক স্থানে স্থির থাকে না, থাকে না তা একটি নির্দিষ্ট রূপের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে।, এতে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা। ফলে ব্যাকরণের বিষয়বস্তুরও পরিবর্তন এবং বিস্তৃতি ঘটেছে, ঘটছে এবং ঘটবে।

প্রশ্ন: ৪। ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা আবিষ্কারের নামই ব্যাকরণ।’— আলোচনা কর। মি. বো. ১২, চ, বো, ‘০৬) কু. বো. ০৭: সি. বো. ০৮: রা, বৌ, ২০০০, ১৫

অথবা, ‘ব্যাকরণ ভাষাকে চলতে নির্দেশ দেয় না, কিংবা শাসন করে না, বরং ভাষাই ব্যাকরণকে শাসন করে বা চলছে। নির্দেশ দেয়, কিংবা ব্যাকরণ ভাষার বর্ণনা করে মাত্র। আলোচনা কর।

অথবা, ভাষা ব্যাকরণকে অনুসরণ করে না, ব্যাকরণই ভাষাকে অনুসরণ করে। ভালোচনা কর। অথবা, ‘ব্যাকরণ ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে না নির্মাণও করে না, তবু ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় না। বক্তব্যটির যথার্থতা বিচার কর। দিল. বো. ১২|

উত্তর : ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলার আবিষ্কারের নামই ব্যাকরণ। ‘ব্যাকরণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি : বি + আ + অন, এর অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘যে বিদ্যার দ্বারা কোনও ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া তাহার স্বরূপটি আলোচিত হয়, এবং সেই ভাষার পঠনে ও লিখনে এবং তাহাতে কথোপকথনে শুদ্ধ-ৰূপে তাহার প্রয়োগ করা যায়, সেই বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ (Grammar) বলে।

‘ব্যাকরণ’ হল ভাষার সংবিধান। ভাষাকে অবলম্বন করেই ব্যাকরণের সৃষ্টি। ভাষার গতি, প্রকৃতি, তার স্বরূপ ব্যাকরণে বিশ্লেষণ করা হয়। ভাষার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ব্যাকরণ থেকে ধারণা লাভ করা যায়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে ভাষার যে সব রীতি প্রচলিত হয়েছে তার বিশ্লেষণই ব্যাকরণের বিষয়বস্তু। ভাষা সৃষ্টি হয়েছে আগে, ব্যাকরণ এসেছে ভাষার পূর্ব ধরে। ভাষার ওপর ব্যাকরণ কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেয় না। প্রচলিত ভাষার মধ্য থেকে নিয়মকে আবিষ্কার করে তাকে সুশৃঙ্খল করে মাত্র। অর্থাৎ ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ভাষার যখন বিশেষ কিছু নিয়ম দাঁড়িয়ে গেছে তখন তা হয়ে উঠেছে ব্যাকরণের বিষয়। ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন ভাষাকে বিশুদ্ধ রাখতে সহায়তা করে। সে জন্যে ব্যাকরণকে ভাষার সংবিধান বলা হয়।

কোনো ভাষা শিখতে বা জানতে গেলে দেখা যায়— সেই ভাষার বর্ণমালা থেকে শুরু করে বাক্যসংযোজন-প্রণালি পর্যন্ত সব কিছুতেই কোনো না কোনো নিয়মনীতি রয়েছে, মাতৃভাষার ক্ষেত্রেও তা থাকে, অথচ অনেক সময় তা আছে বলে মনে হয় না। আসলে, ভাষা মুখ থেকে উচ্চারিত কতকগুলো এলোপাথাড়ি ধ্বনির সমষ্টি নয়। বরং মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ধ্বনিগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট ও সুশৃঙ্খল নিয়ম ও অর্থ থাকে। যেমন- আমি

“উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা-শিক্ষা বইটি পড়ি”

– এই বাকাটিকে যদি লেখা বা বলা হয়—

“বইটি আমি ভাষা শিক্ষা উচ্চতর পড়ি স্বনির্ভর বিশুদ্ধ- তাহলে বাকাটির কোনো অর্থ যেমন বোধগম্য হয় না, তেমনি বাক্যটির ভেতর বক্তব্য প্রকাশের কোনো নিয়ম বা লক্ষ করা যায় না। কাজেই দেখা যায়— ব্যাকরণ কোনো ভাষার উপাদান উপকরণ প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে এই রীতি নীতি ও নিয়ম-পদ্ধতি আবিষ্কার করে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার সন্ধান দেয়। অতএব, “ভাষার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য উদ্ঘাটন ও নিয়ম-শৃঙ্খলার আবিষ্কার করে তার সুবিন্যস্ত ও সুসংহত বর্ণনার নামই ‘ব্যাকরণ’।”

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ-কথা স্পষ্ট যে ভাষার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলার আলোচনাই ব্যাকরণ। ব্যাকরণ

বিশ্লেষণ করে, – ভাষায় কখন কী হওয়া উচিত তা বলে না বা নির্দেশ করে না বা বিধান প্রণয়ন করে না, বর্ণনা করে।

মাত্র। ব্যাকরণের সাহায্যে ভাষার সংগোপন অভ্যন্তর সূত্র উদ্ঘাটন করে ভাষার বিশুদ্ধ রূপ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। ফলে ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় । FR IN পরিশেষে বলা যায়, ভাষা যেন বহতা নদী। উৎসঘার থেকে নদীর বিপুলকায় জলধারা বেরিয়ে সর্পিল গতিতে কভ বাকে কত মোড় নিয়ে এগিয়ে চলে মোহনার দিকে। অনুরূপভাবে বিবর্তন, রূপান্তর ও ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে ভাষারও অগ্রগতি ঘটে। এ-ক্ষেত্রে ব্যাকরণের ভূমিকা ভাষাকে নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা নয়, বরং পরিবর্তনের ধারায় ভাষাকে সু

গতিশীল ও জীবন্ত করে রাখা। তাই বলা হয় ‘ব্যাকরণ ভাষাকে চলতে নির্দেশ দেয় না কিংবা শাসন করে না, বরং ভাষাই ব্যাকরণকে শাসন করে বা চলতে নির্দেশ দেয়, ব্যাকরণ ভাষার বিষয়কে বর্ণনা করে মাত্র।

 

আরও পড়ুন:

 

মন্তব্য করুন