বাংলা উপন্যাস । প্রবন্ধ রচনা , রচনা লিখন

বাংলা উপন্যাস [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ]

বা

উপন্যাস সাহিত্য ও বাংলাদেশ রচনা

বা

বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্য রচনা

বা

বর্তমান উপন্যাসের প্রবণতাসমূহ

বা

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধারার উপন্যাস

বা

বাংলাদেশের উপন্যাসে বিভিন্ন বিষয়

বাংলা উপন্যাস [ রচনা, প্রবন্ধ রচনা ] প্রবন্ধ লেখা, ইংরেজি প্রবন্ধ, প্রবন্ধ লেখার বিন্যাস, প্রবন্ধ লেখার উদাহরণ, সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ লেখা, ইংরেজিতে কীভাবে একটি প্রবন্ধ লিখতে হয়, প্রবন্ধের বিষয় [ Essay writing, English essay, Essay writing format, Essay writing examples, Short essay writing, How to write an essay in English, Essay topics ]
প্রবন্ধ লেখা, ইংরেজি প্রবন্ধ, প্রবন্ধ লেখার বিন্যাস, প্রবন্ধ লেখার উদাহরণ, সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ লেখা, ইংরেজিতে কীভাবে একটি প্রবন্ধ লিখতে হয়, প্রবন্ধের বিষয় [ Essay writing, English essay, Essay writing format, Essay writing examples, Short essay writing, How to write an essay in English, Essay topics ]

ভূমিকা :

বর্তমান যুগে উপন্যাস সাহিত্যের জনপ্রিয়তা সর্বাধিক। এর সাহায্যে সমাজের সর্বস্তরের লোকের মনোরঞ্জন করা যেমন সুসাধ্য, তেমনটি আর কোনো প্রকার সাহিত্য-শিল্পের দ্বারা হয় না। বললেই চলে। উপন্যাস মানুষের কাহিনী, সাধারণ মানুষের কাহিনী। ঔপন্যাসিক অধিকাংশ ক্ষেত্রে কল্পিত কাহিনীর মাধ্যমে মানব জীবনকে বিশ্লেষণে প্রয়াসী হন। গ্রহ-নক্ষত্রখচিত সীমাহীন আকাশ থেকে আরম্ভ করে মাটির মানুষের মনের অবচেতনাংশ উপন্যাসের চারণক্ষেত্র। জীবনের অনন্ত জিজ্ঞাসা ও জীবনপিপাসা বিভিন্ন ভঙ্গিতে এই শ্রেণীর সাহিত্যে রূপায়িত হয়েছে। এর বাহন গদ্য ও পদ্য উভয়ই হতে পারে। তবে গদ্যই এর উৎকৃষ্ট বাহন হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

 

উপন্যাস কি? :

ইংরেজি Novel শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ উপন্যাস। Novel-এর সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়, “Novel is a fictitious prose narrative or tale presenting a picture of a real life of the men and women portrayed.” উপন্যাস শব্দটি সংস্কৃত উপসর্গ ও প্রত্যয়যোগে গঠিত হয়েছে। বুৎপত্তিগত দিক থেকে শব্দটির অর্থ উপস্থাপনা (উপন্যাস = উপ + নি + অস্ + আ)। বঙ্গীয় শব্দকোষ গ্রন্থে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাস শব্দটির অর্থ করেছেন ‘অস্বাভাবিক কল্পিত উপাখ্যান’। নগেন্দ্রনাথ বসু তার ‘বিশ্বকোষ’ গ্রন্থে এর অর্থ করেছেন শ্রোতা বা পাঠকের মনোরঞ্জনার্থে কল্পিত গল্প।

আমরা সাধারণভাবে উপন্যাস বলতে আখ্যায়িকা বা বড় গল্প কাহিনীকে বুঝে থাকি। শ্রীশচন্দ্র দাশের মতে, ‘গ্রন্থকারের ব্যক্তিগত জীবন দর্শন ও জীবানানুভূতি কোনো বাস্তব কাহিনী অবলম্বন করে যে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে রূপায়িত হয় তাকে উপন্যাস কহে।’ অন্যভাবে বলা যায়, যে কল্পিত কাহিনী গদ্যে রচিত হয় এবং পাঠকের মনোরঞ্জনার্থে উপস্থাপিত হয় তা-ই উপন্যাস। এক কথায় মানব জীবনের অখণ্ড কাহিনীর শিল্পসম্মত গদ্য রূপায়ণকে উপন্যাস বলা হয়ে থাকে।

উপন্যাসে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্না, মিলন-বিরহ, সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ, আশা-নিরাশা, জন্ম-মৃত্যু, পাওয়া না পাওয়া, আলো-অন্ধকার প্রভৃতি লেখকের শিল্প প্রতিভাকে আশ্রয় করে ব্যক্ত হয়। অর্থাৎ মানুষের জীবনই উপন্যাসরূপী দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। বিদগ্ধ পাঠক উপন্যাস পাঠ করে আত্মজিজ্ঞাসা ও জীবন জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করেন।

ঔপন্যাসিকের সর্বপ্রধান কর্তব্য সুন্দর করে, সুরসাল করে উপন্যাসের গল্পটিকে বর্ণনা করা। টলস্টয়, স্কট বা বঙ্কিমচন্দ্রের মতো লেখকেরা এ মত সমর্থন করেন। বলার ভঙ্গিটি এমন হবে যে, পাঠক যেন এর পর কি হবে তা জানার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। উপন্যাসকে কেউ কেউ ‘পকেট থিয়েটার’ বা ক্ষুদ্র নাট্য বলে অভিহিত করেন। নাটকে রঙ্গমঞ্চ ও দৃশ্যাবলী যে কাজ করে, ঔপন্যাসিক বর্ণনার সাহায্যে সে কাজটি সম্পন্ন করেন। এর ঘটনাবলী কয়েকটি চরিত্রকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে।

উপন্যাসের গঠন-কৌশল:

উপন্যাসের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও গঠন-কৌশল আছে। একটি সার্থক ও সুন্দর উপন্যাস রচনা করতে হলে চারটি অত্যাবশ্যক উপাদান একান্তভাবে প্রয়োজন। তা হলো ১. কাহিনী বা প্লট, ২. চরিত্র, ৩. ভাষা এবং ৪. পরিবেশ পরিকল্পনা।

উপন্যাসের শ্রেণীবিভাগ:

বিষয়গত দিক থেকে উপন্যাসকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা ১. ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২. সামাজিক উপন্যাস, ৩. কাব্যধর্মী উপন্যাস ও ৪. রহস্যোপন্যাস বা গোয়েন্দা উপন্যাস।

এছাড়া বাংলা সাহিত্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ও প্রকৃতির অজস্র উপন্যাস রচিত হচ্ছে। এদের মধ্যে কিশোর উপন্যাস, কাহিনী উপন্যাস, সাংকেতিক উপন্যাস, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, হাস্যরসাত্মক উপন্যাস, পত্রোপন্যাস প্রভৃতি প্রধান। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত’ একটি উৎকৃষ্ট আত্মজীবনীমূলক এবং বুলবুল ওসমানের ‘কানা মামা’ উৎকৃষ্ট কিশোর উপন্যাস হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

 

 

বাংলা উপন্যাস:

বাংলা সাহিত্যে পৃথিবীর অন্যান্য সাহিত্যের মতোই উপন্যাস এসেছে বেশ পরে— উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে। তবে ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর উইলিয়াম কেরির উদ্যোগে বাংলা গদ্য রচনার সূচনা হয়। বাংলা গদ্য হাঁটি হাঁটি পা পা করে উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারীচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের হাতে মার্জিত রূপ লাভ করে। এদের পূর্বসুরি রাজা রামমোহন রায় পরিশীলিত গদ্য রচনা করে গিয়েছেন। পরিশীলিত গদ্যের বিকাশের পরেই বাংলা উপন্যাসের উদ্ভব।

প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস। কিন্তু চরিত্র সৃষ্টি, ভাষা ও কাহিনীর দুর্বলতার কারণে একে সর্বাঙ্গসুন্দর সার্থক উপন্যাস বলা যায় না। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস রচিত হয় ১৮৬৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। তাকেই বাংলা উপন্যাসের জনক বলা হয়। বাংলা উপন্যাসের যথার্থ উদ্ভব ও বিকাশ বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই। তিনি ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘রাজসিংহ’, ‘সীতারাম’, ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ইন্দিরা’, ‘রজনী’ প্রভৃতি উপন্যাস রচনা করে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা উপন্যাসকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বাংলা সাহিত্যের কতিপয় উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক ও তাদের উপন্যাস:

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমসাময়িক ঔপন্যাসিক হলেন রমেশচন্দ্র দত্ত ও মীর মশাররফ হোসেন। মীর মশাররফ হোসেন কারবালার কাহিনী অবলম্বনে ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস রচনা করে প্রচুর খ্যাতিলাভ করেন। তারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কল্পতরু’, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী প্রভৃতি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এরপর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাব হয়। সমাজ জীবনের বাস্তব সমস্যা ও নর-নারীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসে প্রথম পরিলক্ষিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো ‘বৌ ঠাকুরাণীর হাট’, ‘রাজর্ষি’, ‘চোখের বালি’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘যোগাযোগ’, ‘শেষের কবিতা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ‘রত্নদ্বীপ’, নজীবর রহমান ‘আনোয়ারা’ লিখে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।। এরপর আসেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার উপন্যাসে বঞ্চিত মানুষের ব্যথা-বেদনা, সমাজের অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, নির্যাতিত বিধবা নারীর আর্তনাদ প্রভৃতি মূর্তিমান হয়ে ওঠে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো ‘বড়দিদি’, ‘মেজদিদি’, ‘চরিত্রহীন’, ‘শেষ প্রশ্ন’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘পথের দাবী’, ‘শেষের পরিচয়’, ‘কাশীনাথ’, ‘বামুনের মেয়ে’ ইত্যাদি।

এরপর কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ উপন্যাস রচনা করে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর বাংলা উপন্যাসের বিষয় ও ভাবগত দিক থেকে নানাবিধ পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময় শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, সত্যেন সেন, সরদার জয়েন উদ্দিন, শহীদুল্লাহ কায়সার, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ উপন্যাস রচনা করে এপার বাংলার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। অপরদিকে যাযাবর, অবধৃত, বিমল মিত্র, শক্তিপদ রাজগুরু, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, সমরেশ বসু প্রমুখ ঔপন্যাসিকগণ ওপার বাংলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

 

 

বাংলাদেশের উপন্যাস :

বিভাগোত্তরকালে বাংলাদেশে নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। ফলে উপন্যাস সাহিত্যে ব্যাপক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন সাধিত হয়। শওকত ওসমানের ‘জননী’, আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সারেং বৌ’ ও ‘সংশপ্তক’, শহীদ জহির রায়হানের ‘বরফ গলা নদী প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক ঝড় তুলেছে। এগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচুর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রতিভাধর ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব ঘটেছে।

এদের উপন্যাসে ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও বর্তমান বিশ্ব সমস্যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এ সকল কথাশিল্পী বলিষ্ঠ জীবন চেতনা ও আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসায় তৎপর হয়ে উঠেছেন। উপন্যাসের আঙ্গিক, রীতি-নীতির ক্ষেত্রেও চলছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরা জীবনকে দেখছেন সম্পূর্ণ আধুনিক দৃষ্টিতে। আধুনিক উপন্যাস আজ সমস্ত বিশ্বব্যাপী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপরিমিত সত্যমানস ও জিজ্ঞাসা কৌতূহলের বাহন হয়ে উঠেছে। হৃদয়ের প্রত্যেক সমস্যাই আজকাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের সাথে অচ্ছেদ্য বলে অনুভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপন্যাসে বৈচিত্র্যময়তা বাংলাদেশের শান্ত-স্নিগ্ধ পল্লীশ্রী এখানকার উপন্যাসে রূপলাভ করলেও শহুরে জীবন উপেক্ষিত হয়নি। আমবাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের বৈচিত্র্যময়তা যেমন উপন্যাসে স্থানে পেয়েছে, তেমনি নাগরিক জীবনের সমস্যাও এখানে স্থান পেয়েছে। মোটকথা বাংলাদেশের উপন্যাসে গ্রামীণ জীবন, নাগরিক জীবন, আঞ্চলিক জীবনচিত্র, মনস্তত্ত্ব, ঐতিহাসিক চেতনা, যৌনচেতনা, রাজনৈতিক চেতনা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে।

বিষয়বস্তুর এই বৈচিত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে মুহম্মদ আবদুল হাই যথার্থই মন্তব্য করেছেন, একদিকে কৃষিভিত্তিক পল্লীজীবন, অপরদিকে আধুনিক দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ নাগরিক জীবন; একদিকে পূর্ববঙ্গের ঐশ্বর্যময় বহিঃপ্রকৃতির বর্ণনা, অপরদিকে আধুনিক মানুষের জটিল অন্তর প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ; একদিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ, অপরদিকে রোমান্টিক কল্পনার বিলাস; একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিক্ষুব্ধ পটভূমিকায় মানুষের অস্থিরতা, অপরদিকে হৃদয়াবেগের চিরন্তন পটে প্রতিষ্ঠিত প্রেমিক মানুষ। সবই আমাদের বাংলা উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে।

গ্রামবাংলার বাস্তব চিত্র ও ধর্মান্ধ মানুষের স্বার্থপর কার্যকলাপ রূপলাভ করেছে ‘লালসালু’ উপন্যাসে। গ্রামের দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সঙ্কট ও স্বার্থপর মানুষের অত্যাচার-উৎপীড়নের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ উপন্যাসে। সমুদ্র উপকূলের নাগরিকদের জীবন কাহিনী রূপলাভ করেছে ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসে। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আর শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ উপন্যাসে যৌনচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। জহির রায়হানের অধিকাংশ উপন্যাসে আধুনিক মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় নাগরিক জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে।

শওকত আলীর ‘পিঙ্গল আকাশ’ উপন্যাসে হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতার পরিচয় উঠেছে। ‘কাঞ্চনমালা’ ‘কাশবনের কন্যা’ উপন্যাসে জেলে বেদেদের জীবন কাহিনী তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার উঠেছে। খানের ‘অনুকল্প’ উপন্যাসে আধুনিক নিঃসঙ্গতা, শূন্যতাবোধ, প্রেম এবং সংস্কারের রূপায়িত হয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের হাজারো বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে। বাংলা বৈচিত্র্য লক্ষ্য জনৈক সমালোচক মন্তব্য করেছেন— “No doubt man creates own form no novelist has created one.”

যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ঔপন্যাসিকের জীবন জিজ্ঞাসারও পরিবর্তন সাধন ঘটেছে। কিন্তু তাদের জীবন কতখানি গভীর করে, বিস্তৃত করে, সত্য করে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ নরনারীর ভাগ্যকে পরিস্ফুট করেছে, তাদের ক্ষণপ্রাণ জীবনকে মহিমা করেছে তাদের সৃষ্টি Tolstoy War and Peace, Dostoevsky-র Idiot, Thackeray-1 Vanity Lawrence-এর Sons Lovers-এর মতো উৎকৃষ্ট বৈচিত্র্যময় হলেও বাংলাদেশের উপন্যাসও তেমন পিছিয়ে নেই। বিভিন্ন তাদের উপন্যাসে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে উপন্যাস রচনা করে যারা খ্যাতির শীর্ষে আছেন তারা হলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শওকত আলী, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আমজাদ হোসেন, রাজিয়া সেলিনা হোসেন, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমদ, ইমদাদুল হক মিলন, মইনুল আহসান সবচেয়ে জনপ্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। উপন্যাস এপার ওপার বাংলায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। নিকট অতীতে অন্য কোনো বাঙালির উপন্যাস এমনভাবে সমাদৃত হয়নি। সুতরাং দেখা যে, বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছে এবং বাংলা তথা বিশ্বের উপন্যাস সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ন স্থান করে নিয়েছে।

 

 

উপসংহার :

উপন্যাস আজ মানুষের মহাকাব্যরূপে রূপায়িত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকৃতি সাধারণ এবং তাদের জীবনপ্রবাহ, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-আনন্দ এমনকি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনচিত্র হয়েছে। যেসব উপন্যাস খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছে, সেগুলোর অধিকাংশেই গ্রামবাংলা, পল্লীপ্রকৃতি ও নৈসর্গিক উঠেছে। কেননা বাংলাদেশের অধিকাংশ পল্লী অঞ্চলের মানুষের হতাশার ঔপন্যাসিকেরা অত্যন্ত বিশ্বস্ততার বৈচিত্র্যময় করে চিত্রিত করে বাংলাদেশের উপন্যাস সময়ের পেরিয়ে বিহঙ্গের মতো মেলে ধরেছে।

আরও পড়ুন:

বাংলা কবিতার বিবর্তন [ Evolution of Bengali Poetry ] প্রবন্ধ রচনা

মন্তব্য করুন